September 24, 2021, 6:09 am

#

‘সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় এবং বর্তমান প্রজন্ম’

‘সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় এবং বর্তমান প্রজন্ম’

একটা সময় ছিলো যখন সন্ধার আগে ঘরে ঘরে পড়ার আওয়াজে মুখরিত হতো পাড়া, মহল্লা। কখনো কখনো লোডশেডিং বা গরমে উঠোনে শীতল পাটি বিছিয়ে গল্প, আড্ডা হতো, বাবা,মা, দাদা,দাদী, চাচা, চাচীসহ পরিবারের বয়স্ক মানুষ গুলো পুরোনো দিনের ঐতিহ্য, নীতিকথা, গানের আড্ডা, গল্পের আড্ডা হতো তখন পারিবারিক সম্পর্ক জোরদার হতো, পরিবারের সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্যবোধ, স্নেহ,ভালোবাসা, প্রেম, আন্তরিকতা সৃষ্টি হতো, এবং পারিবারিক বন্ধন গুলোতে ছিলো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু উন্নতির ছোঁয়ায় আমাদের প্রজন্ম গুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পারিবারিক ভ্রাতৃত্ববোধ, নীতিনৈতিকতা ভুলে তারা বিপথগামী হচ্ছে।
করোনা মহামারীর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার জন্য পাঠ্য বইয়ের বাহিরে আমাদের স্টুডেন্ট পাঠকসমাজ। বেড়ে যাচ্ছে পারিবারিক বৈষম্য, সামাজিক অবক্ষয়! কারণ এই প্রজন্মের শিক্ষার্থী গুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে দীর্ঘদিন সু-শিক্ষা থেকে বঞ্চিত! পারিবারিক শিক্ষা তো আরো বাজে অবস্থার মধ্যে পৌছিয়ে গেছে কারণ সন্তান সারাদিন মোবাইল নিয়েই ব্যস্থ থাকছে।কারণে অকারণে ফেসবুকিং, নেট ব্রাউজিং, পাবজি,ফ্রি ফায়ারসহ ভিডিও গেমসহ সারাদিন মোবাইল কেন্দ্রীক, মোবাইল মুখী জীবনযাপন করছে তারা যার ফলে পরিবারকে সময় দেওয়া হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে যে, সকালবেলা যে পরিবারে সবাই মিলে সকালের নাস্তা করতো সেখানে তাদের সন্তানরা ঘুম থেকে উঠছে দশটা এগারোটার দিকে! তার কারণ রাত জেগে মোবাইলিং, ফেসবুকিং, নেট ব্রাউজিং! এবং দুপুরের খাবারও এক সাথে খাওয়া হয় না, আর রাতের বেলা যে সন্তানকে পড়ার টেবিলে থাকার কথা সেখানে সে থাকছে বাহিরে মোবাইল বন্ধি! পরিবারের সাথে কখনো একসাথে খেতে বসলেও সন্তান থাকে অমনোযোগী কারণ তাদের হাতে তখনো থাকছে মোবাইল! যার কারণে পরিবারে কখন কি হচ্ছে তা আমাদের সন্তান গুলো খবর রাখছে না।তারা মোবাইল কেন্দ্রীক জীবনযাপন করার জন্য পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যার কারণে সন্তানের মনন মগজে সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি না হয়ে অসামাজিকতা তৈরি হচ্ছে। একটা সময় তার ব্রেন মানসিক চাপ গ্রহণ করতে না পেরে পারিবারিক অনুশাসন বিধিবিধান তার ইচ্ছা বিরোধী মনে হবে! শাসন বারণের জন্য বাবা মায়ের সাথে সম্পর্কের অবনতি,এবং উগ্রবাদী মন মানসিকতা তৈরি হবে এবং খুব সহজেই এক ধরনের চমৎকার কম্বিনেশমূলক শান্তির জন্য সেসব শিক্ষার্থীদের ব্রেন ওয়াশ করে ধর্মীয় উগ্রবাদী চিন্তা এবং জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে!
খেলাধুলা,বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি পছন্দ করে না এমন মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। যদিও পড়ে তবে তারা হয়তো অসামাজিক পশু নয়তো দেবতা।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,আমাদের বর্তমান প্রজন্ম, আমাদের শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠ ছেড়ে বন্ধুদের আড্ডা ছেড়ে সারাদিন মোবাইলে ডুবে গিয়ে প্রাকৃতিক, পারিবারিক, সামাজিক মূলবোধ, শিক্ষা, সাহিত্য,সংস্কৃতি, একতা, ধর্মবিশ্বাস থেকে অনেকটা দূরে সরে যাচ্ছে তারা। দুই বন্ধু এক সাথে দীর্ঘ সময় পার করছে কিন্তু কারো সাথে কারো কথা হয়না আন্তরিকতা নিয়ে! বন্ধু মানে হলো আত্মার বন্ধন,বন্ধু মানে হলো দুইটা দেহে একটা আত্মা, সেক্রিফাইজড,আনন্দ, কোলাহল, সুখ, দুঃখ এসবের বিশ্বস্ত সঙ্গী’ই হলো বন্ধু। কিন্তু দুই বন্ধু এক সাথে দীর্ঘ সময় পার করছে একজন জানে না আরেক জনের মনের খবর।দুই জনে দীর্ঘ সময় এক সাথে অতিবাহিত করছে কিন্তু ডুবে থাকছে মোবাইলে! তাদের কথা হয় ম্যাসেজিংয়ে! এই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই দিন শেষে হতাশা,একাকীত্ব,একঘেয়েমি,অসফলতা এবং ব্যতিক্রমধর্মী অসামাজিক চিন্তা চেতনায় ভোগে।
তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতটা না সামাজিক বাস্তবে তার চাইতেও বেশি অসামাজিক! চোখের সামনে দূর্ঘটনা ঘটছে ছবি তুলে,লাইভে গিয়ে সে সমস্যার সমাধান করে,গুজবে সহজেই বিশ্বাস করে কুসংস্কার ছড়িয়ে দিচ্ছে।ভাইরাল হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন সবই করছে।কোন ভিক্ষুকদের সহযোগিতা,রক্তদান করবে,কোন মানুষের ভালো করবে,পরোপকার করবে তার সাথে ফটোসেশান এবং ফেসবুক লাইভে তা প্রচার করছে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন রকম।যে ছেলেটি স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে,অনলাইনে সামাজিকতা দেখাচ্ছে তার পরিবারে খোঁজ করলে দেখা যাবে তার বেডের মশারীটা এখনো তোলা হয়নি,তার বইগুলো এলোমেলো,মা বাবা কাজ করতে করতে নাজেহাল অবস্থা!সে পরিবারের সুখে দুঃখে সময় না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সামাজিকতা দেখাচ্ছে যা মূল্যবোধ থেকে বিবেচনা করে দেখলে বিষয়টি দেখা যাবে অসামাজিকতা!
কখন সূর্য উঠছে,সূর্য ডুবছে,মসজিদে আজান হচ্ছে,দিন যাচ্ছে রাত হচ্ছে এতো এতো কিছু হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমাদের বর্তমান প্রজন্ম সেসব শেষ কবে দেখেছে, শুনেছে তা বলা কঠিন।ঈদ মানে আনন্দ,উদযাপন,সহানুভূতি, বা প্রেমময় পরিবেশে ভরপুর। একটা সময় ছিলো যখন ঈদে মানুষ মানুষে কোলাকুলি হতো,মানুষ মানুষে মেলবন্ধন ঘটতো ঈদে,আশেপাশের গরিব,ধনী সকল মানুষের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নেওয়া এবং ঈদকে ভাগাভাগি করা হতো,বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা হতো, একজন একজনের বাড়ি গিয়ে সময় ব্যয় করা, খাদ্য, বিনোদন, কুশলাদি বিনিময় হতো কিন্তু বর্তমানে ঈদ উদযাপন, আনন্দ উদযাপন মানে মোবাইল ইউজড করা।দেখা হলে সালাম বিনিময়,কুশলাদি বিনিময় না করে সেল্ফি তুলছে।যার ফলে দীর্ঘ একটা গ্যাপ তৈরি হচ্ছে তাদের মধ্যে। তাদের মন মানসিকতার মধ্যে পরিবর্তন ঘটছে!যুক্তি-বুদ্ধির পরিবর্তে উগ্রবাদী মনমানসিকতা তৈরি হয়ে সামাজিক এবং ধর্মীয় জীবন ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে। আপনার সন্তানকে আমাদের এই প্রজন্মকে মোবাইল এবং ইন্টারনেট আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হলে যা যা প্রয়োজনঃ
১. সুস্থ সংস্কৃতির ব্যবস্থা করা।সুস্থ সংস্কৃতি মানুষের মন এবং মগজ দুটোই পরিবর্তন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।নাটক সিনেমা থেকে আমাদের ব্রেন দীর্ঘমেয়াদি লড়াই করতে শিখে এবং চিন্তা করতে শিখে।ভালো খারাপ উপলব্ধি করতে পারে।
২. বই পড়া। বই হচ্ছে আত্মার খোরাক।বইয়ের পাতায় বন্দি যে স্মৃতি বা কল্পনা লুকিয়ে থাকে সন্তানের মন মগজে মোবাইলের পরিবর্তে কল্পনা শক্তি এবং ধৈর্য আত্মবিশ্বাসী,সুস্থ চিন্তাভাবনা করতে সহযোগিতা করে।তাই আপনার সন্তান ছোট হলে তার জন্মদিনে দামী দামী গিপ্টের পরিবর্তে গল্প,উপন্যাস, ধর্মীয়,এডভেঞ্চার,ডিটেকটিভ বই গিপ্ট করতে পারেন।
৩. বিনোদনঃ খেলাধুলা, গান,আড্ডাবাজি হারাম ঘোষণা না করে তাকে ঐক্যবদ্ধ হতে শেখান।মানুষের সাথে মিশতে দিন এতে করে নানামুখী মানুষ থেকে জীব-বৈচিত্র শিখতে পারবে।যেসব শিশু জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের করতে বঞ্চিত হয়ে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তখন প্রকৃতি তাকে ভালো এবং খারাপ দু’টো শেখারই সুযোগ করে দেয়।তাই সন্তানের দেহ বিকাশের দিকে যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি মেধা বিকাশের দিকে নজর দিতে হবে।যার কারণে তাকে মাঠে খেলতে পাঠানো,গান শোনা,আড্ডা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।একজন শিশু তার শিক্ষকের চাইতেও তার সম বয়সী বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে বেশি শিখতে,বৈচিত্র্যময় হতে,এবং ব্যতিক্রম হতে পছন্দ করে।কেননা আমরা শিশুদের যাচাই বাচাই করে থাকি বয়স্ক ব্রেন বা বড় মনমানসিকতা থেকে অথচ ক্ষুদ্র শিশু বা শিক্ষার্থী তাদের দেখা উচিত তাদের মতো করে।
৪. ধর্ম পালনঃ আপনার সন্তানকে নবী রাসুল, কোরান, হাদিস চর্চার পাশাপাশি চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে শেখাবেন।অহেতুক ভয় না দেখিয়ে আত্মবিশ্বাসী, সহনশীলতা শেখাবেন। যেমন, এটা করলে গুনাহ্ হবে এটা করা যাবে না,ঐটা করা যাবে না,ঐটা করলে আল্লাহ্ গুনাহ্ দিবে।জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবে! আপনি আপনার সন্তানকে,শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় বিধিনিষেধ শেখানোর পাশাপাশি হালাল এবং ব্যতিক্রমধর্মী কাজ কর্মের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিবেন।এটা হারাম ঐটা হারাম। তার জীবনে হারামের প্রভাব, শাস্তির ভয় না দেখিয়ে আশা দেখাবেন।স্রষ্টার বড়ত্ব,ক্ষমা,প্রেমের বিষয় গুলো শিক্ষাদানের প্রতি গুরুত্ব দিবেন।
৫.ভ্রমণঃ আপনার সন্তান, শিক্ষার্থীদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করার জন্য বায়ু পরিবর্তন করা জরুরি। ভ্রমণ মানুষের হৃদয়ের চক্ষুকে খুলে দেয়। এবং তাকে বাস্তবিক হতে শেখায়, ধৈর্যশীল, কষ্টসহিষ্ণু, পরোপকারী,বিনয়ী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ভ্রমণ! *

মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ।

#

     আরো পড়ুন:

পুরাতন খবরঃ

শুক্র শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০